মধ্যপ্রদেশের সিঙ্গরৌলির ধিরৌলি অঞ্চলে জঙ্গল সাফ করে তৈরি হচ্ছে কয়লাখনি প্রকল্প। ছাড়পত্র মিলেছে কেন্দ্রের। এই কয়লাখনি প্রকল্পের জন্য প্রায় ১,৪০০ হেক্টর বনভূমি কয়লাখনির জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে, পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, এর ফলে ৬ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটা পড়বে। যে জঙ্গল বহু বছর ধরে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, প্রাণীকুলের আশ্রয় এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যের রক্ষাকবচ হিসেবে ছিল, তা আজ কয়লার খাদানে পরিণত হতে চলেছে। যেমন, চিতা, শ্লথ, ভাল্লুক, বুনো কুকুর, নীলগাই, বিপন্ন প্রজাতির প্যাঁচা ও শকুনের বাসস্থান জবরদখল করা হবে। মধ্যপ্রদেশ-ছত্তিশগড় সীমানার হাতির করিডোর পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে। এই প্রকল্পের বিস্তর বিরোধের পরেও― জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ সময়ে দাঁড়িয়ে যখন পৃথিবীর নানা দেশ বন সংরক্ষণ নিয়ে কথা বলছে, তখন ভারতে উল্টোদিকে জঙ্গল কাটার ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে বনাধিকার আইন ও গ্রামসভার সম্মতি নিয়েও। আদিবাসী ও বননির্ভর মানুষের মতামতকে কার্যত অগ্রাহ্য করেই এই প্রকল্প এগিয়ে চলেছে। ফলে উচ্ছেদ হবেন ৪৫০০-র বেশি আদিবাসী মানুষ। উন্নয়নের নামে যদি মানুষের জমি, জঙ্গল, নদী এবং ভবিষ্যৎ কেড়ে নেওয়া হয়, তবে সেই উন্নয়ন আসলে কাদের জন্য?
আজ থেকে তিন বছর আগে ধিরৌলি কয়লাখনি সম্প্রসারণের ছাড়পত্র পায় আদানি গোষ্ঠী৷ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খননকার্যের অনুমতি দেয় কেন্দ্রের কয়লা মন্ত্রক। শুরুর সময় থেকেই এই ধ্বংসযজ্ঞের তীব্র বিরোধীতায় নামেন স্থানীয় অধিবাসী ও পরিবেশকর্মীরা৷ এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় গ্রীন ট্রাইবুনালে মামলা করেন পরিবেশকর্মী অজয় দুবে। অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে গ্রীন ট্রাইবুনাল এই মামলা খারিজ করে দেয় এই অজুহাতে যে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে মামলা করা হয়েছে। এখানেই না থেমে গ্রীন ট্রাইবুনালকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যান অজয় বাবু। কিন্তু সকলেই জানেন, হাল আমলে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকাও বারংবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই ঘটনাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এত বড় একটা ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে কোনো রকম প্রচেষ্টা না করেই অজয় বাবুর মামলাকে অংশত নাকচ করে দেয় সুপ্রীম কোর্ট।
সাম্প্রতিক অতীতে আমরা দেখেছি গোটা দেশজুড়ে অরণ্য নিধনের ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বনভূমি ধ্বংস করে আদানিকে ভেট দেওয়া হয়েছে কয়লাখনি নির্মানের জন্য। ছত্তিশগড়ের হাসদেও, গাড়ে পেলমা অঞ্চল, ওড়িশার তালাবিরা অঞ্চল, ঝাড়খণ্ডের গোন্দলপুরা অঞ্চল এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে আদানির ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট তৈরির জন্য ব্যাপক বনভূমি ধ্বংসের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। এর ফলস্বরূপ পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ আদিবাসী জনজাতির মানুষকে ভিটেহারা হতে হচ্ছে, এমনকি নিশ্চিহ্নের পথে এগিয়ে চলেছে কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়।
একদিকে যেমন, জঙ্গল বাঁচানো মানে শুধু গাছ বাঁচানো নয়—মানুষের জীবন, জল, বাতাস, প্রাণীকুল এবং ভবিষ্যৎকে বাঁচানো। অন্যদিকে, প্রকৃতি ধ্বংস করে কোনো সভ্যতার উন্নয়ন হয় না। একদিকে যেমন, জঙ্গল বাঁচানো মানে শুধু গাছ বাঁচানো নয়—মানুষের জীবন, জল, বাতাস, প্রাণীকুল এবং ভবিষ্যৎকে বাঁচানো। অন্যদিকে, প্রকৃতি ধ্বংস করে কোনো সভ্যতার উন্নয়ন হয় না। এখন দেখার আরও উন্নয়ন প্রকল্পের নামে জঙ্গল ধ্বংসের পথ আরও প্রশস্ত হয় কি না, নাকি পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে সরকার ও প্রশাসন সত্যিই আরও দায়বদ্ধ ভূমিকা নেয়!
